Physiotherapy

ঘাড় ব্যথা কেন হয়, কারণ ও ৭ টি করণীয়

ঘাড় ব্যথা কেন হয়, কারণ ও ৭ টি করণীয়

আপনার ঘাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে এই নিবন্ধটি সাহায্য করবে। বর্তমান সময়ে ঘাড় ব্যথা একটি সাধারণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে যা আমাদের সবার জীবনকে অনেক অতিষ্ঠ করে। আপনি কি জানেন কেন হঠাৎ করে আপনার ঘাড়ে তীব্র ব্যথা শুরু হতে পারে বা বাড়ে? আজকে, আমরা ঘাড় ব্যথার প্রধান কারণগুলো এবং প্রতিকারের সঠিক উপায়গুলো নিয়ে আলোচনা করব।

ঘাড়ের মাংসপেশিতে টান লাগা থেকে শুরু করে হাড়ের ক্ষয় পর্যন্ত অনেকগুলো বিষয় এখানে কাজ করে। চলুন আমরা ধাপে ধাপে জেনে নেই কিভাবে আপনি ঘরোয়া উপায়ে এবং ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে সুস্থ থাকবেন।

ঘাড় ব্যথা কেন হয় এবং এর মূল কারণসমূহ –

ঘাড় ব্যথা হওয়ার পেছনে অনেকগুলো শারীরিক এবং জীবনযাত্রার সাথে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ কারণ সরাসরি জড়িত থাকে। আমরা যখন দীর্ঘ সময় ধরে ভুল ভঙ্গিতে বসে মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যবহার করি তখন চাপ বাড়ে। এই অতিরিক্ত চাপের ফলে ঘাড়ের চারপাশের মাংসপেশিগুলো খুব দ্রুত ক্লান্ত হয়ে যায় এবং তীব্র ব্যথার সৃষ্টি হয়।

ভুল ভঙ্গিতে বসা বা শোয়ার প্রভাব:

অনেকেই সারাদিন ডেস্কে বসে কাজ করার সময় ঘাড় বাঁকিয়ে রাখেন যা মেরুদণ্ডের জন্য খুবই ক্ষতিকর। দীর্ঘক্ষণ কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে ঘাড়ের সামনের দিকের পেশিগুলো অনেক বেশি সংকুচিত হয়ে ঝুলে পড়ে। ঘুমানোর সময় খুব উঁচু বা খুব নিচু বালিশ ব্যবহার করলেও ঘাড়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। সঠিক বালিশ নির্বাচন না করলে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

টেক্সট নেক সিনড্রোম এবং ডিজিটাল ব্যবহার:

আধুনিক যুগে স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার ঘাড় ব্যথার একটি অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে ডাক্তাররা চিহ্নিত করেছেন। নিচে তাকিয়ে দীর্ঘ সময় মেসেজ টাইপ করলে ঘাড়ের হাড়ের ওপর ওজনের চেয়েও কয়েক গুণ চাপ পড়ে। একেই চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় “টেক্সট নেক” বলা হয় যা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ব্যথার প্রকোপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই অভ্যাস ত্যাগ না করলে ভবিষ্যতে ঘাড়ের ডিস্ক সরে যাওয়ার মতো বড় ধরণের জটিলতা তৈরি হয়।

সারভাইকাল স্পন্ডাইলোসিস বা হাড়ের ক্ষয়:

বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমাদের মেরুদণ্ডের হাড় এবং ডিস্কের মধ্যে স্বাভাবিক পিচ্ছিলতা বা জেল ভাব কমে যায়। একে সারভাইকাল স্পন্ডাইলোসিস বলা হয় যা সাধারণত চল্লিশ বছরের বেশি বয়সের মানুষের মধ্যে অনেক বেশি দেখা দেয়। হাড়ের এই ক্ষয় ঘাড়ের চারপাশের নার্ভ বা স্নায়ুর ওপর চাপ তৈরি করে অসহ্য ব্যথার সৃষ্টি করে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করালে এই ব্যথা হাতের আঙুল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং ঝিনঝিন করে।

পেশি সংকোচন এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপ:

যখন আপনি অনেক বেশি মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন তখন আপনার ঘাড়ের পেশিগুলো অনিচ্ছাকৃতভাবে শক্ত হয়ে যায়। এই ধরণের সংকোচন দীর্ঘস্থায়ী হলে ঘাড়ে রক্ত সঞ্চালন কমে যায় এবং ব্যথা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। অনেক সময় অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার কারণে ঘাড় এবং মাথার পেছনের অংশে এক ধরণের ভারি ভাব অনুভূত হয়। নিয়মিত শিথিলকরণ ব্যায়াম এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম এই ধরণের পেশি সংকোচন দূর করতে অনেক বড় ভূমিকা পালন করে।

ঘাড় ব্যথার ৭ টি করণীয় যা আপনাকে দ্রুত সুস্থ করবে –

ঘাড় ব্যথা দূর করতে হলে আপনাকে অবশ্যই সঠিক কিছু নিয়ম এবং ব্যায়াম নিয়মিত পালন করতে হবে। নিচে বিশেষজ্ঞ ফিজিওথেরাপিস্টদের পরামর্শ অনুযায়ী সাতটি কার্যকর করণীয় বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো যা আপনার উপকারে আসবে।

১. বসার সঠিক ভঙ্গি বা পজিশন ঠিক রাখা:

আপনি যখন চেয়ারে বসে কাজ করবেন তখন আপনার পিঠ এবং ঘাড় সোজা রাখার চেষ্টা করুন। কম্পিউটার স্ক্রিন সবসময় আপনার চোখের সমান্তরালে রাখুন যাতে ঘাড় নিচু করে দীর্ঘ সময় দেখতে না হয়। কাজ করার সময় মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক বাঁক বজায় রাখতে পিঠের নিচে একটি ছোট কুশন বা বালিশ দিন। প্রতি ৩০ মিনিট অন্তর নিজের বসার ভঙ্গি পরিবর্তন করুন এবং ঘাড়কে সামান্য নাড়াচাড়া করে আরাম দিন।

২. নিয়মিত ঘাড়ের স্ট্রেচিং এবং আইসোমেট্রিক ব্যায়াম:

ব্যথা কমাতে ঘাড়ের পেশিকে শক্তিশালী করার জন্য কিছু সহজ ব্যায়াম প্রতিদিন নিয়ম করে করা খুব প্রয়োজন। আপনার হাতের তালু কপালে রেখে ঘাড় দিয়ে সামনের দিকে চাপ দিন এবং হাত দিয়ে তা বাধা দিন। একইভাবে মাথার পেছনে এবং দুই পাশে হাত রেখে চাপ দিয়ে ঘাড়ের মাংসপেশিগুলোকে শক্ত করার অভ্যাস করুন। এই ব্যায়ামগুলো করলে ঘাড়ের হাড়ের স্থিতিশীলতা বাড়ে এবং পেশিগুলো অনেক বেশি নমনীয় এবং কর্মক্ষম হয়ে ওঠে।

৩. গরম এবং ঠান্ডা সেঁক বা থেরাপি প্রয়োগ:

হঠাৎ করে আঘাতজনিত কারণে ব্যথা হলে প্রথম ৪৮ ঘণ্টা আক্রান্ত স্থানে বরফ দিয়ে ঠান্ডা সেঁক দিন। ঠান্ডা সেঁক দিলে আক্রান্ত জায়গার ফোলা ভাব কমে যায় এবং রক্ত জমাট বাঁধার সম্ভাবনা অনেকটা হ্রাস পায়। দীর্ঘদিনের বা ক্রনিক ব্যথার ক্ষেত্রে গরম পানির ব্যাগ বা হট প্যাক ব্যবহার করা অনেক বেশি কার্যকর। গরম সেঁক পেশির আড়ষ্টতা কমায় এবং রক্ত চলাচল বৃদ্ধি করে আপনার ব্যথা দ্রুত উপশম করতে সাহায্য করে।

৪. সঠিক বালিশ এবং শোয়ার নিয়ম মেনে চলা:

ঘুমানোর সময় এমন বালিশ ব্যবহার করুন যা আপনার ঘাড় এবং মাথার মধ্যবর্তী শূন্যস্থান পূরণ করতে পারে। খুব নরম বা খুব শক্ত বালিশ এড়িয়ে চলুন কারণ এটি ঘাড়ের স্বাভাবিক আকৃতি নষ্ট করে দেয়। পাশ ফিরে ঘুমানোর অভ্যাস করলে আপনার ঘাড় এবং মেরুদণ্ড একই সরলরেখায় থাকে যা ব্যথার ঝুঁকি কমায়। পেটের ওপর ভর দিয়ে ঘুমানো এড়িয়ে চলুন কারণ এতে ঘাড় একদিকে দীর্ঘ সময় বেঁকে থাকতে বাধ্য হয়।

৫. কর্মক্ষেত্রে বিরতি নেওয়া এবং হাঁটাচলা করা:

একটানা দীর্ঘ সময় ল্যাপটপ বা ডেস্কটপের সামনে বসে থাকা ঘাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ হতে পারে। প্রতি এক ঘণ্টা কাজ করার পর অন্তত পাঁচ মিনিটের জন্য সিট থেকে উঠে একটু হাঁটাচলা করুন। বিরতির সময় আপনার কাঁধ এবং ঘাড় হালকাভাবে ঘুরিয়ে পেশির ক্লান্তি দূর করার চেষ্টা করা খুব ভালো। কাজ করার মাঝে ছোট ছোট বিরতি নিলে আপনার মনোযোগ বাড়ে এবং শরীরের রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া স্বাভাবিক থাকে।

৬. পর্যাপ্ত পানি পান এবং পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ:

আমাদের মেরুদণ্ডের ডিস্কের অধিকাংশ অংশই পানি দিয়ে গঠিত তাই পর্যাপ্ত পানি পান করা অত্যন্ত জরুরি বিষয়। শরীরে পানির অভাব হলে ডিস্ক শুকিয়ে যেতে পারে এবং হাড়ের মধ্যে ঘর্ষণের ফলে তীব্র ব্যথা হতে পারে। ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার যেমন দুধ, ডিম এবং সামুদ্রিক মাছ নিয়মিত আপনার খাদ্যতালিকায় রাখুন। পুষ্টিকর খাবার হাড়ের ঘনত্ব বাড়াতে সাহায্য করে এবং বয়সজনিত ক্ষয় রোধ করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।

৭. অভিজ্ঞ ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ গ্রহণ করা:

যদি উপরের নিয়মগুলো পালনের পরেও আপনার ব্যথা না কমে তবে একজন বিশেষজ্ঞ ফিজিওথেরাপিস্টের সাথে দেখা করুন। ফিজিওথেরাপিস্ট আপনার ব্যথার আসল কারণ নির্ণয় করে নির্দিষ্ট কিছু আধুনিক থেরাপি এবং ব্যায়ামের চার্ট প্রদান করবেন। ম্যানুয়াল থেরাপি এবং ইলেকট্রোথেরাপির মাধ্যমে ঘাড়ের গভীরের পেশিগুলোকে পুনরায় সচল করা সম্ভব যা ওষুধের চেয়ে কার্যকর। অযথা পেইন কিলার না খেয়ে প্রাকৃতিক উপায়ে সুস্থ হওয়ার জন্য ফিজিওথেরাপি গ্রহণ করা সবচেয়ে নিরাপদ এবং ভালো।

রোগীর জন্য বিশেষ কিছু স্বাস্থ্য টিপস –

ঘাড় ব্যথা অবহেলা করলে এটি প্যারালাইসিস বা শরীরের অবশ ভাব তৈরির মতো বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। MR Physiotherapy সবসময় পরামর্শ দেয় যে ব্যথার শুরুতে সঠিক ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা গ্রহণ করা উচিত। আপনি যদি নিয়মিত ঘাড়ের যত্ন নেন তবে ভবিষ্যতে বড় কোনো সার্জারি বা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হবে না।

সঠিক জুতো পরা এবং ভারী ব্যাগ একদিকে না ঝোলানো আপনার ঘাড়ের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। প্রতিদিন অন্তত ১৫ থেকে ২০ মিনিট রোদে বসুন যাতে আপনার শরীর পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক ভিটামিন ডি পায়।

উপসংহার –

ঘাড় ব্যথা কোনো অভিশাপ নয় বরং এটি আমাদের ভুল জীবনযাত্রার একটি সংকেত যা সময়মতো ঠিক করা যায়। সঠিক ভঙ্গি, নিয়মিত ব্যায়াম এবং সুষম খাবার গ্রহণের মাধ্যমে আপনি আজীবন ঘাড়ের ব্যথা থেকে মুক্ত থাকতে পারেন। যদি আপনার হাত অবশ লাগে বা ব্যথা হাতের নিচের দিকে নামে তবে কালক্ষেপণ না করে ডাক্তার দেখান।

সুস্থ মেরুদণ্ডই হলো একটি সচল জীবনের চাবিকাঠি তাই নিজের শরীরের প্রতি যত্নশীল এবং সচেতন হওয়া জরুরি। আমাদের এই স্বাস্থ্য নির্দেশিকাগুলো মেনে চলে আপনি একটি ব্যথামুক্ত এবং সুন্দর কর্মময় জীবন অতিবাহিত করতে পারবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *