Blog
ঘাড়ের ডান বা বাম পাশে ব্যথার কারণ ও কার্যকরী প্রতিকার
ঘাড়ের ডান বা বাম পাশে ব্যথা আজকাল অনেকের জন্যই একটি বড় সমস্যা। দীর্ঘক্ষণ একটানা কাজ করলে ঘাড়ের পেশীতে অতিরিক্ত চাপ পড়ে ব্যথা শুরু হয়। সঠিক সময়ে এই ব্যথার চিকিৎসা না করালে এটি ধীরে ধীরে মারাত্মক আকার ধারণ করে। আজকের এই নিবন্ধে আমরা ঘাড় ব্যথার সম্পূর্ণ কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে জানব।
ঘাড়ের ডান পাশে ব্যথার মূল কারণসমূহ –
ঘাড়ের ডান দিকে ব্যথা হওয়ার পেছনে বেশ কিছু সাধারণ এবং জটিল কারণ থাকে। দৈনন্দিন জীবনের কিছু ভুল অভ্যাস মূলত এই ধরনের ব্যথার জন্য দায়ী হয়। চলুন ঘাড়ের ডান পাশে ব্যথার প্রধান কারণগুলো সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
পেশীর টান বা মাসল স্ট্রেইন:
আমরা অনেক সময় হঠাৎ করে ঘাড় ঘোরাতে গেলে পেশীতে মারাত্মক টান লাগে। এর ফলে ঘাড়ের ডান দিকে তীব্র ব্যথা অনুভব করা খুব স্বাভাবিক একটি ঘটনা। দীর্ঘক্ষণ একভাবে বসে কম্পিউটার ব্যবহার করলেও ঘাড়ের পেশীতে অতিরিক্ত স্ট্রেইন তৈরি হয়।
ভুল ভঙ্গিতে দীর্ঘক্ষণ ঘুমানো:
রাতে ঘুমানোর সময় ঘাড়ের পজিশন সঠিক না থাকলে সকালে তীব্র ব্যথা হতে পারে। খুব উঁচু বা খুব শক্ত বালিশ ব্যবহার করা ঘাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এর কারণে ঘাড়ের ডান দিকের রগ বা পেশীতে অনেক বেশি টান লেগে যায়।
হুইপল্যাশ বা আকস্মিক আঘাত:
গাড়িতে ভ্রমণের সময় হঠাৎ ব্রেক কষলে ঘাড়ে মারাত্মক ঝাঁকুনি লাগতে পারে। এই ধরনের আকস্মিক আঘাতকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় হুইপল্যাশ ইনজুরি বলা হয়ে থাকে। এর ফলে ঘাড়ের ডান দিকের লিগামেন্ট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ব্যথার সৃষ্টি করে।
ঘাড়ের বাম পাশে ব্যথার প্রধান কারণ –
ঘাড়ের বাম পাশে ব্যথা হওয়ার কারণগুলো অনেক সময় ডান দিকের মতোই হয়ে থাকে। তবে কিছু নির্দিষ্ট শারীরিক সমস্যার কারণে বাম দিকে বেশি ব্যথা অনুভূত হতে পারে।
নার্ভ কম্প্রেশন বা স্নায়ুর উপর চাপ:
ঘাড়ের হাড়ের মধ্যে থাকা ডিস্ক সরে গেলে স্নায়ুর উপর মারাত্মক চাপ পড়ে। এই সমস্যাটিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় সাধারণত সারভাইক্যাল রাডিকুলোপ্যাথি বলা হয়ে থাকে। এর ফলে ঘাড়ের বাম পাশ থেকে ব্যথা ধীরে ধীরে বাম হাতে ছড়িয়ে পড়ে।
সারভাইক্যাল স্পন্ডাইলোসিস সমস্যা:
বয়স বাড়ার সাথে সাথে ঘাড়ের হাড় এবং ডিস্ক ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে। এই ক্ষয়জনিত রোগকে সাধারণত সারভাইক্যাল স্পন্ডাইলোসিস বা ঘাড়ের বাত বলা হয়। এটি ঘাড়ের বাম পাশে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা এবং আড়ষ্টতা তৈরি করার অন্যতম প্রধান কারণ।
মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তা:
অতিরিক্ত মানসিক চাপ ঘাড় এবং কাঁধের পেশীতে অনেক বেশি উত্তেজনা তৈরি করে। এর ফলে ঘাড়ের বাম পাশের পেশীগুলো শক্ত হয়ে যায় এবং ব্যথা শুরু হয়। মানসিক প্রশান্তি ছাড়া এই ধরনের ঘাড়ের ব্যথা পুরোপুরি দূর করা প্রায় অসম্ভব।
রোগীদের জন্য সঠিক চিকিৎসার সুবিধা –
সঠিক সময়ে ঘাড় ব্যথার চিকিৎসা গ্রহণ করলে রোগীরা অনেক ধরনের সুবিধা পেয়ে থাকেন। নিচে রোগীদের জন্য সঠিক চিকিৎসার প্রধান বেনিফিট বা সুবিধাগুলো আলোচনা করা হলো।
ব্যথামুক্ত স্বাভাবিক জীবনযাপন:
সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীরা খুব দ্রুত ঘাড়ের তীব্র ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে পারেন। এর ফলে তারা ব্যথামুক্তভাবে নিজেদের দৈনন্দিন সব কাজ খুব সহজেই করতে পারেন।
কর্মক্ষমতা এবং মনোযোগ বৃদ্ধি:
ঘাড়ে ব্যথা থাকলে কোনো কাজেই সঠিকভাবে মনোযোগ দেওয়া একদমই সম্ভব হয় না। চিকিৎসা গ্রহণের পর ব্যথা কমে গেলে কাজের প্রতি মনোযোগ এবং কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
পেশীর ফ্লেক্সিবিলিটি বা নমনীয়তা:
সঠিক ফিজিওথেরাপি এবং ব্যায়ামের মাধ্যমে ঘাড়ের পেশীর স্বাভাবিক নমনীয়তা আবার ফিরে আসে। এর ফলে রোগীরা খুব সহজেই ঘাড় ডান বা বাম দিকে ঘোরাতে সক্ষম হন।
MR Physiotherapy থেকে ঘাড় ব্যথার বিশেষ টিপস –
ঘাড়ের ব্যথা প্রতিরোধ এবং নিরাময়ের জন্য সঠিক গাইডলাইন অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি। নিচে mrphysiotherapy.com থেকে কিছু কার্যকরী এবং স্বাস্থ্যকর টিপস আপনাদের জন্য দেওয়া হলো।
সঠিক বালিশ নির্বাচন করার পদ্ধতি:
ঘুমানোর সময় এমন বালিশ ব্যবহার করুন যা মাথা এবং ঘাড়কে সমানভাবে সাপোর্ট দেয়। মেমরি ফোম বালিশ ঘাড়ের স্বাভাবিক বাঁকা অংশটি ধরে রাখতে অনেক বেশি সাহায্য করে। Mrphysiotherapy এর মতে, খুব বেশি নরম বালিশ ঘাড়ের জন্য একেবারেই ভালো নয়।
কাজের মাঝে নিয়মিত বিরতি নেওয়া:
টানা এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ডেস্কে বসে কাজ করা ঘাড়ের জন্য ক্ষতিকর। প্রতি চল্লিশ মিনিট পর পর উঠে দাঁড়িয়ে ঘাড়ের হালকা স্ট্রেচিং করা উচিত। এতে পেশীর রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকে এবং ঘাড় ব্যথার ঝুঁকি অনেক কমে যায়।
সঠিক বসার ভঙ্গি বা পসচার:
কম্পিউটারে কাজ করার সময় মনিটর সব সময় আপনার চোখের লেভেলে রাখতে হবে। পিঠ সোজা রেখে চেয়ারের সাথে হেলান দিয়ে বসা ঘাড়ের জন্য খুবই উপকারী। সামনের দিকে ঝুঁকে কাজ করার অভ্যাস আজই পরিবর্তন করার চেষ্টা করতে হবে।
ঘাড়ের ব্যথা কমানোর সহজ ঘরোয়া উপায় –
প্রাথমিক পর্যায়ে ঘাড়ের ব্যথা কমানোর জন্য কিছু কার্যকরী ঘরোয়া পদ্ধতি অনুসরণ করা যায়। এই পদ্ধতিগুলো পেশীর রিলাক্সেশন বাড়াতে এবং ব্যথার তীব্রতা কমাতে দারুণ কাজ করে।
বরফ এবং গরম সেঁক বা কমপ্রেস:
হঠাৎ করে ঘাড়ে ব্যথা শুরু হলে প্রথম ৪৮ ঘণ্টা বরফের সেঁক দেওয়া উচিত। এরপর পেশীর আড়ষ্টতা কমানোর জন্য হালকা গরম পানির সেঁক দিলে ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। দিনে তিন থেকে চার বার এই সেঁক দিলে ব্যথা অনেক কমে আসে।
হালকা ম্যাসাজ বা মালিশ:
ব্যথার স্থানে হালকা হাতে ম্যাসাজ করলে পেশীর রক্ত চলাচল অনেক বৃদ্ধি পায়। তবে খুব জোরে বা ভুল পদ্ধতিতে ম্যাসাজ করলে ব্যথা আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। প্রয়োজনে ভালো মানের কোনো পেইন রিলিফ মলম ব্যবহার করে ম্যাসাজ করতে পারেন।
ঘাড়ের ব্যথা দূর করার প্রয়োজনীয় ব্যায়াম –
ঘাড় ব্যথা পুরোপুরি নিরাময়ের জন্য সঠিক নিয়মে নিয়মিত ব্যায়াম করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিচে ঘাড়ের জন্য খুব উপকারী কয়েকটি ব্যায়ামের পদ্ধতি ধাপে ধাপে আলোচনা করা হলো।
নেক স্ট্রেচিং বা ঘাড় টান করার পদ্ধতি:
প্রথমে সোজা হয়ে বসে ডান কান ডান কাঁধের দিকে আস্তে করে নোয়াতে হবে। এই অবস্থায় দশ সেকেন্ড অপেক্ষা করে মাথা আবার সোজা পজিশনে ফিরিয়ে আনুন। একইভাবে বাম পাশেও এই স্ট্রেচিং করুন এবং দিনে পাঁচবার এর পুনরাবৃত্তি করুন।
শোল্ডার রোল বা কাঁধ ঘোরানোর নিয়ম:
সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বা বসে দুই কাঁধ একসাথে উপরের দিকে তুলে ধরতে হবে। এরপর ধীরে ধীরে কাঁধ দুটোকে বৃত্তাকারে পেছন দিকে এবং সামনের দিকে ঘোরাতে হবে। এই ব্যায়ামটি ঘাড় এবং কাঁধের শক্ত পেশীগুলোকে নরম করতে দারুণভাবে সাহায্য করে।
চিন টাক বা থুতনি পেছনের দিকে টানা:
সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে আপনার থুতনিকে হালকা করে পেছনের দিকে টেনে ধরুন। মনে করুন আপনি ডাবল চিন তৈরি করার চেষ্টা করছেন এবং পাঁচ সেকেন্ড ধরে রাখুন। এই ব্যায়ামটি ঘাড়ের পেছনের পেশীগুলোকে শক্তিশালী করতে অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি?
বেশিরভাগ ঘাড় ব্যথা সাধারণ হলেও কিছু ক্ষেত্রে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যাওয়া প্রয়োজন হয়। যদি ঘাড়ের ব্যথা আপনার দুই হাতে বা কাঁধে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। হাতের আঙুল অবশ মনে হলে বা হাতে শক্তি না পেলে দ্রুত ডাক্তার দেখান। জ্বর বা মাথাব্যথার সাথে ঘাড় ব্যথা থাকলে এটি কোনো বড় বিপদের লক্ষণ হতে পারে। Read more: কিভাবে সার্ভিকাল স্পন্ডাইলোসিস স্থায়ীভাবে নিরাময় করা যায়
উপসংহার:
ঘাড়ের ডান বা বাম পাশে ব্যথা বর্তমান সময়ে একটি অত্যন্ত পরিচিত স্বাস্থ্য সমস্যা। তবে সঠিক জীবনযাপন পদ্ধতি এবং সামান্য সচেতনতা এই সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে পারে। সঠিক নিয়মে কাজ করা এবং নিয়মিত ঘাড়ের ব্যায়াম করার কোনো বিকল্প নেই।
প্রয়োজনে mrphysiotherapy.com এর মতো বিশ্বস্ত ওয়েবসাইট থেকে সঠিক ফিজিওথেরাপি টিপস মেনে চলুন। ঘাড়ের যত্ন নিন এবং ব্যথামুক্ত ও একটি সুন্দর সুস্থ জীবন উপভোগ করুন।