Orthopedic

সার্ভিক্যাল স্পন্ডিলাইসিস: কারণ, লক্ষণ ও আধুনিক চিকিৎসা

সার্ভিক্যাল স্পন্ডিলাইসিস

আজকাল ঘাড় ব্যথা অনেকের জন্যই একটি সাধারণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপনি হয়তো দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহার করেন, কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করেন, অথবা ভুলভাবে ঘুমানএগুলোই ধীরে ধীরে বড় একটি সমস্যার দিকে নিয়ে যেতে পারে, যার নাম সার্ভিকাল স্পন্ডাইলোসিস

সহজভাবে বললে, এটি হলো ঘাড়ের হাড় ডিস্কের বয়সজনিত বা ব্যবহারের কারণে ক্ষয় হয়ে যাওয়া। এই সমস্যা শুধু বয়স্কদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়বর্তমানে তরুণদের মধ্যেও এটি দ্রুত বাড়ছে।

এই আর্টিকেলে আপনি জানতে পারবেন:

  • সার্ভিকাল স্পন্ডাইলোসিস আসলে কী 
  • কেন এটি হয় 
  • এর লক্ষণগুলো কী 
  • এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণকীভাবে এটি চিকিৎসা নিয়ন্ত্রণ করা যায় 

এই গাইডটি এমনভাবে লেখা হয়েছে যাতে আপনি সহজেই বুঝতে পারেন এবং প্রয়োজনে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

Cervical Spondylosis Meaning in Bengali (সার্ভিকাল স্পন্ডাইলোসিস এর অর্থ) –

Cervical Spondylosis এর বাংলা অর্থ হলো ঘাড়ের মেরুদণ্ডের হাড় ডিস্কের বয়সজনিত ক্ষয় বা পরিবর্তন সহজভাবে বললে, এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে ঘাড়ের হাড় (vertebrae) এবং তাদের মাঝখানের নরম ডিস্ক ধীরে ধীরে দুর্বল ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে যায়।

আমাদের মেরুদণ্ডের উপরের অংশকে বলা হয় cervical spine বা ঘাড়ের অংশ। এই অংশে মোট ৭টি হাড় থাকে, যেগুলো মাথাকে সাপোর্ট দেয় এবং ঘাড়কে নড়াচড়া করতে সাহায্য করে।

এই হাড়গুলোর মাঝখানে থাকে নরম ডিস্ক, যা শক অ্যাবজরবারের মতো কাজ করে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই ডিস্ক শুকিয়ে যায়, পাতলা হয়ে যায় এবং তার নমনীয়তা কমে যায়। তখন হাড়গুলোর মধ্যে ঘর্ষণ শুরু হয়এটাই মূলত cervical spondylosis

তাই সহজভাবে বলা যায়: Cervical Spondylosis = ঘাড়ের হাড় ডিস্কের ক্ষয়জনিত সমস্যা

সার্ভিক্যাল স্পন্ডিলাইসিস কী?

সহজ কথায় বলতে গেলে, সার্ভিক্যাল স্পন্ডিলাইসিস হলো ঘাড়ের মেরুদণ্ডের হাড় (Vertebrae) এবং হাড়ের মাঝখানের ডিস্কগুলোর বয়সের সাথে সাথে হওয়া ক্ষয়জনিত পরিবর্তন। আমাদের মেরুদণ্ড অনেকগুলো ছোট হাড় দিয়ে গঠিত, যার মাঝে কুশনের মতোডিস্কথাকে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই ডিস্কগুলো শুকিয়ে যায় এবং শক্ত হয়ে যায়, ফলে ঘাড়ের হাড়গুলোতে ঘর্ষণ লাগে এবং ব্যথা সৃষ্টি হয়। একে অনেক সময়ঘাড়ের অস্টিওআর্থ্রাইটিস বলা হয়।

সহজ কথায় বললে, সার্ভিকাল স্পন্ডাইলোসিস হলো ঘাড়ের মেরুদণ্ডের (সার্ভিকাল স্পাইন) বয়সজনিত ক্ষয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একেসার্ভিকাল অস্টিওআর্থ্রাইটিসবানেক অ্যারথ্রাইটিস বলা হয়।

কল্পনা করো তোমার ঘাড়ে সাতটা ছোট ছোট হাড় (কশেরুকা) একের ওপর একটা সাজানো আছে। এদের মাঝে রয়েছে নরম, জেলির মতোডিস্ক” — যেগুলো শকঅ্যাবজরবারের মতো কাজ করে। এছাড়া ছোট ছোট জয়েন্ট, লিগামেন্ট আর মাংসপেশি আছে যা ঘাড়কে নড়াচড়া করতে সাহায্য করে।

বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই ডিস্কগুলোর ভেতরের পানি কমে যায়, ডিস্ক শুকিয়ে ছোট হয়ে যায়। ফলে হাড়গুলো একে অপরের সাথে ঘষা খায়। শরীর তখনমেরামতকরার চেষ্টা করে এবং হাড়ের ওপর ছোট ছোট কাঁটা বাবোন স্পার” (অস্টিওফাইট) তৈরি হয়। এই কাঁটাগুলো কখনো স্নায়ুর ওপর চাপ দেয়, ফলে ব্যথা, অসাড়তা, দুর্বলতা হয়।

এটা কোনো হঠাৎ রোগ নয়। ধীরে ধীরে বছরের পর বছর ধরে চলে। ৪০ বছরের পর থেকে শুরু হয় এবং ৬০ বছরের ওপরে প্রায় ৮৫% মানুষের মধ্যে কোনো না কোনো মাত্রায় দেখা যায়। তবে সবাইতে লক্ষণ দেখা যায় না।

সার্ভিক্যাল স্পন্ডিলাইসিস বিস্তারিতঃ

সার্ভিক্যাল স্পন্ডিলাইসিস বিষয়টি আরও গভীরভাবে বোঝার জন্য আমাদের মেরুদণ্ডের গঠন এবং এতে সময়ের সাথে কী ধরনের পরিবর্তন আসে তা জানা প্রয়োজন। নিচে এটি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হলো:

মেরুদণ্ডের গঠন পরিবর্তনের প্রক্রিয়া:

মেরুদণ্ডের গঠন ও পরিবর্তনের প্রক্রিয়া

আমাদের ঘাড়ের অংশে মেরুদণ্ডের মোট ৭টি ছোট হাড় থাকে, যাদের সার্ভিক্যাল ভার্টিব্রা (Cervical Vertebrae) বলা হয়। এই হাড়গুলোর মাঝে কুশনের মতো নরম ইন্টারভার্টিব্রাল ডিস্ক (Intervertebral Discs) থাকে। এই ডিস্কগুলো শক অ্যাবজরবার হিসেবে কাজ করে, অর্থাৎ আমরা যখন হাঁটাচলা করি বা ঘাড় নাড়াই, তখন হাড়ের ওপর সরাসরি চাপ পড়তে দেয় না।

ভেতরের পরিবর্তনগুলো আসলে কী?

সার্ভিক্যাল স্পন্ডিলাইসিসের সময় প্রধানত তিনটি বড় পরিবর্তন ঘটে:

১) ডিস্কের জলীয় অংশ কমে যাওয়া (Dehydration of Discs):

৪০ বছর বয়সের পর থেকে অধিকাংশ মানুষের মেরুদণ্ডের ডিস্কগুলো শুকিয়ে যেতে শুরু করে। ডিস্ক শুকিয়ে গেলে এটি সংকুচিত হয়ে যায়, ফলে হাড়গুলোর মধ্যে দূরত্ব কমে আসে এবং ঘর্ষণ বেড়ে যায়।

২) হাড়ের বৃদ্ধি বা বোন স্পার (Bone Spurs):

যখন ডিস্কের ক্ষয় হয়, তখন শরীর মেরুদণ্ডকে স্থিতিশীল রাখার জন্য বাড়তি হাড় তৈরি করার চেষ্টা করে। এই বাড়তি হাড়গুলোকেঅস্টিওফাইটবাবোন স্পারবলা হয়। এগুলো অনেক সময় মেরুদণ্ডের ভেতর দিয়ে যাওয়া স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলে হাতে ব্যথা বা অবশ ভাব অনুভূত হয়।

৩) লিগামেন্টের পরিবর্তন (Stiffening of Ligaments):

মেরুদণ্ডের হাড়গুলোকে যুক্ত করে রাখে লিগামেন্ট নামক এক ধরনের শক্ত টিস্যু। বয়সের সাথে এগুলো নমনীয়তা হারিয়ে শক্ত হয়ে যায়, যার ফলে ঘাড় আগের মতো সহজে ঘোরানো যায় না।

কেন একেক্ষয়জনিত রোগবলা হয়?

এটি মূলত কোনো হঠাৎ হওয়া আঘাত নয়, বরং একটি ধীরগতির প্রক্রিয়া। ঠিক যেমন মেশিনের পার্টস অনেকদিন ব্যবহারের ফলে ক্ষয় হয়, আমাদের ঘাড়ের জয়েন্টগুলোও তেমনি ব্যবহারের ফলে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। আধুনিক যুগে দীর্ঘক্ষণ মাথা নিচু করে স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ ব্যবহারের কারণে এই ক্ষয়ের প্রক্রিয়াটি অনেক কম বয়সেই শুরু হয়ে যাচ্ছে (যাকে অনেক সময় Tech Neck বলা হয়)

কখন এটি চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়?

সাধারণত হাড়ের এই পরিবর্তনগুলো সবারই কমবেশি হয়। কিন্তু সমস্যা তখন হয় যখন:

  • মেরুদণ্ডের ভেতর দিয়ে যাওয়া স্পাইনাল কর্ড (Spinal Cord) চেপে যায় (Cervical Myelopathy)
  • ঘাড় থেকে হাতে নেমে যাওয়া নার্ভ রুট (Nerve Roots) সংকুচিত হয় (Cervical Radiculopathy)

সহজ কথায়: এটি কেবল একটি হাড়ের সমস্যা নয়, বরং এটি ঘাড়ের হাড়, ডিস্ক, লিগামেন্ট এবং স্নায়ুর একটি সম্মিলিত জটিলতা যা সঠিক সময়ে যত্ন না নিলে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার কারণ হতে পারে।

সার্ভিকাল স্পন্ডাইলোসিস কেন হয়?

সার্ভিকাল স্পন্ডাইলোসিস কেন হয়

সার্ভিকাল স্পন্ডাইলোসিস সাধারণত একদিনে তৈরি হয় নাএটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা একটি সমস্যা। আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাস, বয়স, কাজের ধরন এবং শরীরের যত্নের অভাবসবকিছু মিলেই এই রোগের পেছনে কাজ করে। নিচে প্রতিটি কারণ বিস্তারিতভাবে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা হলো, যেন আপনি নিজের জীবনের সাথে মিলিয়ে বুঝতে পারেন।

বয়সজনিত পরিবর্তন (Age-related Degeneration):

সার্ভিকাল স্পন্ডাইলোসিস এর সবচেয়ে বড় এবং স্বাভাবিক কারণ হলো বয়স। বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমাদের শরীরের অন্যান্য অংশের মতোই মেরুদণ্ডেও পরিবর্তন আসে। ঘাড়ের হাড়গুলোর মাঝখানে যে নরম ডিস্ক থাকে, তা ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায় এবং তার নমনীয়তা কমে যায়।

এই ডিস্কগুলো মূলত শক অ্যাবজরবারের মতো কাজ করেমানে ঝাঁকুনি বা চাপ থেকে হাড়কে রক্ষা করে। কিন্তু বয়স বাড়লে এই ডিস্ক শক্ত পাতলা হয়ে যায়। ফলে হাড়ের মধ্যে ঘর্ষণ শুরু হয় এবং ছোট ছোট হাড়ের বাড়তি অংশ (bone spur) তৈরি হতে পারে। এই পরিবর্তনগুলোই ধীরে ধীরে ব্যথা, শক্ত হয়ে যাওয়া এবং নার্ভে চাপ সৃষ্টি করে।

দীর্ঘক্ষণ মোবাইল কম্পিউটার ব্যবহার:

বর্তমান যুগে এটি সার্ভিকাল স্পন্ডাইলোসিস এর  অন্যতম প্রধান কারণ। আমরা অনেকেই ঘন্টার পর ঘন্টা মোবাইল ব্যবহার করি বা ল্যাপটপ/ডেস্কটপের সামনে বসে থাকি। বেশিরভাগ সময়ই আমরা মাথা নিচু করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকি।

এই অবস্থায় ঘাড়ের উপর স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি চাপ পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, মাথা যত নিচু হয়, ঘাড়ের উপর তত বেশি ওজনের চাপ পড়ে। যেমনমাথা ৩০ ডিগ্রি নিচু করলে প্রায় ১৮২০ কেজি সমান চাপ পড়ে ঘাড়ে!

এই অতিরিক্ত চাপ দীর্ঘদিন ধরে পড়তে থাকলে ঘাড়ের ডিস্ক দ্রুত ক্ষয় হতে শুরু করে। অবস্থাকে অনেক সময় “Text Neck Syndrome” বলা হয়, যা বর্তমানে তরুণদের মধ্যে খুবই সাধারণ।

ক) খারাপ পোস্চার (Poor Posture):

আমাদের বসা, দাঁড়ানো এবং কাজ করার ভঙ্গি সরাসরি ঘাড়ের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে। আপনি যদি নিয়মিত কুঁজো হয়ে বসেন, মাথা সামনে এগিয়ে রাখেন বা চেয়ারে সঠিক সাপোর্ট না নিয়ে কাজ করেনতাহলে ঘাড়ের হাড় পেশীর উপর অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হয়।

দীর্ঘদিন এই ভুল অভ্যাস চালিয়ে গেলে পেশীগুলো দুর্বল হয়ে যায় এবং মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক কার্ভ নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে ঘাড়ে ব্যথা, Stiffness এবং পরবর্তীতে স্পন্ডাইলোসিসের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

খ) আঘাত বা ইনজুরি (Neck Injury):

কখনো কখনো ঘাড়ে সরাসরি আঘাত পাওয়ার কারণেও সার্ভিকাল স্পন্ডাইলোসিস হতে পারে। যেমনরোড অ্যাক্সিডেন্ট, হঠাৎ পড়ে যাওয়া, বা খেলাধুলার সময় ইনজুরি।

এই ধরনের আঘাতে ঘাড়ের ডিস্ক, লিগামেন্ট বা জয়েন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অনেক সময় শুরুতে সমস্যা কম মনে হলেও, ধীরে ধীরে সেই জায়গায় ডেজেনারেশন শুরু হয় এবং পরে গিয়ে ব্যথা অন্যান্য জটিলতা তৈরি করে।

গ) জেনেটিক কারণ (Genetic Factors):

কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই রোগের পেছনে পারিবারিক ইতিহাসও ভূমিকা রাখে। যদি আপনার পরিবারে বাবামা বা কাছের কারো ঘাড়ের হাড় ক্ষয়ের সমস্যা থাকে, তাহলে আপনার ক্ষেত্রেও এর ঝুঁকি কিছুটা বেশি থাকতে পারে।

এর কারণ হলোহাড়ের গঠন, ডিস্কের গুণমান এবং জয়েন্টের স্থায়িত্ব অনেকটাই জেনেটিকভাবে নির্ধারিত হয়। তাই কেউ কেউ একই লাইফস্টাইল অনুসরণ করেও অন্যদের তুলনায় দ্রুত এই সমস্যায় ভুগতে পারেন।

ঘ) শারীরিক কার্যকলাপের অভাব (Lack of Physical Activity):

বর্তমানে অনেকেই দীর্ঘ সময় বসে কাজ করেন এবং শারীরিকভাবে খুব কম সক্রিয় থাকেন। নিয়মিত ব্যায়াম না করলে ঘাড় পিঠের পেশীগুলো দুর্বল হয়ে যায়। এই পেশীগুলোই মূলত মেরুদণ্ডকে সাপোর্ট দেয়। যখন এগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন পুরো চাপটা হাড় ডিস্কের উপর পড়ে। ফলে খুব দ্রুত ডেজেনারেশন শুরু হয় এবং ব্যথা দেখা দেয়।

ঙ) ভারী কাজ বা অতিরিক্ত চাপ (Heavy Lifting & Repetitive Stress):

যারা নিয়মিত ভারী জিনিস তোলেন বা একই ধরনের কাজ বারবার করেন (যেমন: কারখানার কাজ, নির্মাণ কাজ), তাদের ঘাড়ের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এই পুনরাবৃত্ত চাপ (repetitive stress) ধীরে ধীরে ডিস্ক জয়েন্ট ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিশেষ করে যদি সঠিক টেকনিক ব্যবহার না করা হয়, তাহলে সার্ভিকাল স্পন্ডাইলোসিস এর ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

ঙ) ধূমপান অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন:

অনেকেই জানেন না যে ধূমপানও মেরুদণ্ডের স্বাস্থ্যের উপর খারাপ প্রভাব ফেলে। ধূমপানের কারণে ডিস্কে রক্ত সঞ্চালন কমে যায়, ফলে ডিস্ক দ্রুত ক্ষয় হয়ে যায়। এছাড়া অনিয়মিত ঘুম, স্ট্রেস, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসএসব কিছুই শরীরের রিকভারি ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, যা স্পন্ডাইলোসিসের ঝুঁকি বাড়ায়।

ভালো দিক হলো, এই কারণগুলোর বেশিরভাগই আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। সঠিক অভ্যাস গড়ে তুললে এই রোগ অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব।

সার্ভিকাল স্পন্ডাইলোসিসের লক্ষণ (Symptoms) –

সার্ভিকাল স্পন্ডাইলোসিসের লক্ষণ (Symptoms)

সার্ভিকাল স্পন্ডাইলোসিসের লক্ষণগুলো সাধারণত ধীরে ধীরে শুরু হয় এবং সময়ের সাথে বাড়তে থাকে। শুরুতে অনেকেই এটিকে সাধারণ ঘাড় ব্যথা ভেবে অবহেলা করেন। আসল সমস্যা হলোযখন এই লক্ষণগুলো দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, তখন তা নার্ভে চাপ সৃষ্টি করে আরও জটিল অবস্থার দিকে নিয়ে যেতে পারে।

এই অংশে আমরা সার্ভিকাল স্পন্ডাইলোসিসের প্রতিটি লক্ষণ বিস্তারিতভাবে, সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করছি যাতে আপনি নিজের উপসর্গগুলো সহজেই মিলিয়ে নিতে পারেন।

ক) ঘাড়ে ব্যথা শক্ত হয়ে যাওয়া (Neck Pain & Stiffness):

সার্ভিকাল স্পন্ডাইলোসিসের সবচেয়ে কমন লক্ষণ হলো ঘাড়ে ব্যথা। এই ব্যথা অনেক সময় হালকা থেকে শুরু হয়যেমন একটু টান লাগা বা অস্বস্তি। সময়ের সাথে সাথে এটি তীব্র হতে পারে।

অনেকেই বলেন,

  • সকালে ঘুম থেকে উঠে ঘাড় শক্ত লাগে 
  • একদিকে ঘোরাতে গেলে ব্যথা করে 
  • দীর্ঘ সময় বসে থাকলে ব্যথা বাড়ে 

এই stiffness বা শক্ত হয়ে যাওয়ার কারণে ঘাড়ের স্বাভাবিক নড়াচড়া কমে যায়। আপনি হয়তো লক্ষ্য করবেন, আগে যেভাবে সহজে মাথা ঘোরাতে পারতেন, এখন তা করতে কষ্ট হচ্ছে।

খ) কাঁধ, বাহু হাতে ব্যথা ছড়িয়ে পড়া (Radiating Pain):

এই সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলো ব্যথা শুধু ঘাড়ে সীমাবদ্ধ না থাকা। বরং এটি ধীরে ধীরে কাঁধ, বাহু এবং হাত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এর কারণ হলো: ঘাড়ের মেরুদণ্ড থেকে বের হওয়া নার্ভগুলো চাপা পড়ে যায়। যখন এই নার্ভে চাপ পড়ে, তখন ব্যথা সেই নার্ভের পথ ধরে নিচের দিকে ছড়িয়ে পড়ে।

অনেক সময় রোগীরা বলেন: ঘাড়ের চেয়ে হাতে ব্যথা বেশি লাগছে

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সিগন্যাল, যা অবহেলা করা উচিত নয়।

গ) ঝিনঝিন করা অবশ ভাব (Tingling & Numbness):

নার্ভে চাপ পড়লে শুধু ব্যথাই হয় না, অনুভূতিতেও পরিবর্তন আসে। আপনি অনুভব করতে পারেন

  • হাতে বা আঙুলে ঝিনঝিন করা 
  • সুই ফোটার মতো অনুভূতি 
  • কিছু জায়গা অবশ হয়ে যাওয়া 

এই ধরনের অনুভূতি সাধারণত একদিকে বেশি হয়ডান বা বাম হাতে।

অনেক সময় আপনি লক্ষ্য করবেন, মোবাইল ধরে রাখলে বা কোনো কিছু ধরে রাখলে হাত হালকা অসাড় হয়ে যাচ্ছে। এটি নার্ভ কম্প্রেশনের একটি ক্লাসিক লক্ষণ।

ঘ) পেশী দুর্বলতা (Muscle Weakness):

সার্ভিকাল স্পন্ডাইলোসিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং একটু সিরিয়াস লক্ষণ হলো পেশী দুর্বল হয়ে যাওয়া। যখন নার্ভ দীর্ঘদিন চাপা পড়ে থাকে, তখন সেই নার্ভ যেসব পেশীকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে।

আপনি হয়তো লক্ষ্য করবেন:

  • হাত দিয়ে জিনিস শক্ত করে ধরতে পারছেন না 
  • বোতল খোলা বা ভারী কিছু তুলতে কষ্ট হচ্ছে 
  • হাত দ্রুত ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে 

এই লক্ষণটি দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া খুব জরুরি।

ঙ) মাথা ঘোরা ভারসাম্য সমস্যা (Dizziness & Balance Issues):

কিছু রোগীর ক্ষেত্রে সার্ভিকাল স্পন্ডাইলোসিসের কারণে মাথা ঘোরা অনুভূত হতে পারে। বিশেষ করে ঘাড় নাড়ানোর সময় বা হঠাৎ উঠে দাঁড়ালে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। এর কারণ হলোঘাড়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালী নার্ভ মস্তিষ্কের সাথে সংযুক্ত। যখন সেখানে চাপ পড়ে, তখন রক্ত সঞ্চালন বা সিগন্যাল ট্রান্সমিশন কিছুটা ব্যাহত হতে পারে।

এর ফলে হতে পারে:

  • মাথা হালকা লাগা 
  • ভারসাম্য হারানো 
  • হাঁটার সময় অস্বস্তি 

চ) ঘাড়ে শব্দ হওয়া (Clicking or Grinding Sound):

অনেক সময় ঘাড় নাড়ালেকট কটবাগ্রাইন্ডিংধরনের শব্দ শোনা যায়। এটি সাধারণত হাড়ের মধ্যে ঘর্ষণের কারণে হয়। যদিও সবসময় এটি গুরুতর সমস্যা নির্দেশ করে না, তবে যদি এর সাথে ব্যথা বা stiffness থাকে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত।

ছ) মাথাব্যথা (Headache):

সার্ভিকাল স্পন্ডাইলোসিসের কারণে অনেক সময় মাথার পেছনের অংশে ব্যথা শুরু হয়, যা ধীরে ধীরে মাথার উপর বা কপাল পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে। এই ধরনের মাথাব্যথাকে অনেক সময় “Cervicogenic Headache” বলা হয়।

লক্ষণগুলো হতে পারে:

  • ঘাড় থেকে মাথার দিকে ব্যথা উঠা 
  • দীর্ঘ সময় কাজের পর মাথাব্যথা বাড়া 
  • ঘাড় নাড়ালে ব্যথা বাড়া 

জ) গুরুতর লক্ষণ (Advanced Symptoms):

যদি সমস্যা অনেকদিন ধরে অবহেলা করা হয়, তাহলে কিছু গুরুতর লক্ষণ দেখা দিতে পারে। যেমন:

  • হাঁটতে সমস্যা হওয়া 
  • হাতপায়ের সমন্বয় নষ্ট হওয়া 
  • ভারসাম্য হারানো 
  • প্রস্রাব বা পায়খানা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা (খুব গুরুতর

এই ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে এটি একটি জরুরি অবস্থাদ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

সার্ভিকাল স্পন্ডাইলোসিসের রোগ নির্ণয় যেভাবে করা হয়ঃ

আপনার ডাক্তার প্রথমে আপনার লক্ষণ ও চিকিৎসার ইতিহাস জানবেন। তারপর কিছু পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হবেন:

শারীরিক পরীক্ষা: ডাক্তার আপনার ঘাড়, কাঁধ, হাত-পায়ের মুভমেন্ট, রিফ্লেক্স এবং পেশির শক্তি পরীক্ষা করবেন। মাথা বা ঘাড়ের নির্দিষ্ট অবস্থানে ব্যথা বাড়ে কি না তা যাচাই করবেন।

ইমেজিং পরীক্ষা:

  • এক্স-রে (X-ray): হাড়ের গঠন, ডিস্কের জায়গা কমে যাওয়া, হাড়ের স্পার (অস্টিওফাইট) দেখা যায়।
  • সিটি স্ক্যান (CT Scan): হাড়ের গঠন আরও বিস্তারিত দেখা যায়।
  • এমআরআই (MRI): এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এতে নরম টিস্যু (ডিস্ক, লিগামেন্ট, স্পাইনাল কর্ড, স্নায়ু) খুব স্পষ্টভাবে দেখা যায়। কোথায় কতটুকু চাপ পড়েছে তা জানার জন্য এটি অপরিহার্য।

নার্ভ কন্ডাকশন স্টাডি (Nerve Conduction Study): স্নায়ুর মাধ্যমে সিগন্যাল কতটা দ্রুত যাচ্ছে এবং পেশির কার্যকারিতা কেমন, তা পরিমাপ করা হয়।

চিকিৎসা: বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সার্জারি লাগে না!

সার্ভিকাল স্পন্ডাইলোসিসের সবচেয়ে বড় সুসংবাদ হলোপ্রায় ৯০% রোগীর ক্ষেত্রে সার্জারির দরকার হয় না সঠিক সময়ে শুরু করা ননসার্জিক্যাল চিকিৎসা দিয়েই ব্যথা অনেকাংশে কমানো যায়, দৈনন্দিন জীবন স্বাভাবিক হয়ে ওঠে এবং রোগের অগ্রগতি থামানো যায়। এটা কোনো জাদু নয়, বরং ধৈর্য, নিয়মিততা এবং সঠিক পদ্ধতির সমন্বয়ের ফল।

চিকিৎসা সাধারণত ধাপে ধাপে করা হয়। ডাক্তার আপনার সার্ভিকাল স্পন্ডাইলোসিস  লক্ষণের তীব্রতা, বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং পরীক্ষার রিপোর্ট দেখে পরিকল্পনা তৈরি করেন। চলুন বিস্তারিত জেনে নিই।

১) লাইফস্টাইল পরিবর্তন ঘরোয়া ব্যবস্থা:

চিকিৎসার ভিত্তি হলো তোমার দৈনন্দিন অভ্যাস বদলানো। এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলোই অনেক সময় বড় ফল দেয়।

  • সঠিক পোসচার মেনটেইন করা: মোবাইল বা ল্যাপটপ চোখের সমান উচ্চতায় রাখুন, যাতে ঘাড় নিচু না হয়। প্রতি ৩০৪৫ মিনিট পর উঠে হাঁটাহাঁটি করো এবং ঘাড় হালকা করে ঘুরিয়ে নিন।
  • গরম ঠান্ডা সেঁক: ব্যথা শুরুর প্রথম ৪৮ ঘণ্টা ঠান্ডা সেঁক (আইস প্যাক) এবং পরে গরম সেঁক (হট ওয়াটার ব্যাগ) ব্যবহার করুন। এতে প্রদাহ কমে এবং পেশি শিথিল হয়।
  • ঘুমের অভ্যাস: নরম, অর্থোপেডিক বালিশ ব্যবহার করুন যাতে ঘুমের সময় ঘাড় সোজা এবং সাপোর্টেড থাকে। পেট উপুড় করে ঘুমানো এড়িয়ে চলো।
  • অন্যান্য: ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখো, ধূমপান একদম ছেড়ে দাও এবং ভারী জিনিস একা তুলতে গিয়ে ঘাড়ে চাপ না দাও।

২) ওষুধপত্র:

ব্যথা প্রদাহ কমাতে ডাক্তার সাধারণত NSAIDs (যেমন: ইবুপ্রোফেন, ন্যাপ্রক্সেন) দেন। এগুলো ব্যথা কমায় এবং ফোলা কমিয়ে দেয়। কখনো মাসল রিল্যাক্সান্ট দেওয়া হয় যাতে ঘাড়ের পেশি শিথিল হয়। খুব তীব্র ব্যথায় স্বল্পমেয়াদী স্টেরয়েড (যেমনপ্রেডনিসোন) দেওয়া যেতে পারে। তবে মনে রাখবেন, ওষুধ শুধু লক্ষণ সামলায়, মূল সমস্যা সমাধান করে না। তাই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া লম্বা সময় খাবেন না এবং পেটের সমস্যা হলে চিকিৎসক কে জানাবেন।

৩) ফিজিওথেরাপি এক্সারসাইজ:

এটাই সার্ভিকাল স্পন্ডাইলোসিসের চিকিৎসারহিরো একজন অভিজ্ঞ ফিজিওথেরাপিস্টের তত্ত্বাবধানে সপ্তাহের একটা স্ট্রাকচার্ড প্রোগ্রাম অনেক রোগীর জীবন বদলে দেয়। 

প্রথমে স্ট্রেচিং এক্সারসাইজ দিয়ে ঘাড়ের নমনীয়তা বাড়ানো হয়যেমন, মাথা ধীরে ধীরে বামডান ঘোরানো, কান কাঁধের দিকে নামানো, চিবুক বুকের দিকে নামানো ইত্যাদি। তারপর স্ট্রেংথেনিং এক্সারসাইজঘাড় উপরের পিঠের মাংসপেশিকে শক্তিশালী করা, যাতে ঘাড় নিজে থেকে সাপোর্ট পায়। 

আইসোমেট্রিক এক্সারসাইজ (হাত দিয়ে চাপ দিয়ে ঘাড়কে স্থির রাখা) খুব কার্যকরী। অনেক সময় ট্র্যাকশন (মৃদু টান) দেওয়া হয় যাতে ডিস্কের মাঝে জায়গা বাড়ে এবং স্নায়ুর চাপ কমে। 

ইলেকট্রিক্যাল স্টিমুলেশন (TENS), আল্ট্রাসাউন্ড বা ম্যানুয়াল থেরাপিও ব্যবহার করা হয়। সপ্তাহে দিন থেরাপি নিয়ে বাকি দিন ঘরে নিয়মিত এক্সারসাইজ করলে সপ্তাহের মধ্যে অনেকের ব্যথা ৭০৮০% কমে যায়। 

সাঁতার কাটা বা হালকা যোগা (বিশেষ করে চাইল্ড পোজ, ক্যাটকাউ) এই রোগের জন্য অসাধারণ।

৪) সার্ভিকাল কলার (Cervical Collar) এর সীমিত ব্যবহার:

কিছু ক্ষেত্রে ডাক্তার সাময়িকভাবে সার্ভিকাল কলার ব্যবহার করতে বলতে পারেন। এটি ঘাড়কে সাপোর্ট দেয় এবং নড়াচড়া কমিয়ে ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। তবে এটি দীর্ঘ সময় ব্যবহার করা ঠিক নয়।

কারণ:

  • এতে পেশী দুর্বল হয়ে যেতে পারে 
  • প্রাকৃতিক নড়াচড়া কমে যায় 

তাই এটি শুধুমাত্র স্বল্প সময়ের জন্য এবং ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করা উচিত।

৫) অন্যান্য থেরাপি:

যদি ওপরের চিকিৎসায় পুরোপুরি স্বস্তি না মেলে, তাহলে স্টেরয়েড ইনজেকশন (এপিডুরাল বা ফেসেট জয়েন্ট ইনজেকশন) দেওয়া হয়। এটা প্রদাহ খুব দ্রুত কমিয়ে দেয় এবং কয়েক মাস স্বস্তি দিতে পারে। রেডিওফ্রিকোয়েন্সি অ্যাবলেশনের মতো আধুনিক পদ্ধতিও কিছু ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়।

কখন সার্জারি লাগতে পারে:

সার্জারি সাধারণত খুব কম ক্ষেত্রে (১০%) দরকার হয়। 

যখন কনজারভেটিভ চিকিৎসা মাসেরও বেশি করেও সার্ভিকাল স্পন্ডাইলোসিস এর লক্ষণ না কমে, বা যখন স্নায়ুতে গুরুতর চাপ পড়েযেমন হাতপায়ে দুর্বলতা বাড়ছে, অসাড়তা ছড়িয়ে যাচ্ছে, হাঁটতে সমস্যা হচ্ছে, ভারসাম্য হারাচ্ছে, বা মাইলোপ্যাথি (স্পাইনাল কর্ডে চাপ) এর লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। 

এই অবস্থায় দেরি করলে স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। আধুনিক সার্জারিতে ডিস্ক রিমুভ করে জায়গা বাড়ানো, বোন স্পার কাটা, বা ডিস্ক রিপ্লেসমেন্ট/ফিউশন করা হয়। সফলতার হার ভালো, এটা শেষ অপশন।

সার্ভিকাল স্পন্ডাইলোসিস নিরাময় এর  ঘরোয়া করণীয় (Home Remedies) –

সার্ভিকাল স্পন্ডাইলোসিস নিরাময় এর  ঘরোয়া করণীয়

সার্ভিকাল স্পন্ডাইলোসিসের ক্ষেত্রে কিছু সহজ ঘরোয়া অভ্যাস মেনে চললে ব্যথা অনেকটাই কমানো যায়। বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ে এগুলো নিয়মিত করলে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব।

১) গরম ঠান্ডা সেঁক:

ঘাড়ে ব্যথা বা পেশীর টান থাকলে গরম সেঁক খুব উপকারী। এটি পেশী শিথিল করে এবং রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়। অন্যদিকে, ফোলা বা ইনফ্লামেশন থাকলে ঠান্ডা সেঁক ব্যবহার করলে আরাম পাওয়া যায়। প্রতিদিন ১০১৫ মিনিট করে বার সেঁক দিতে পারেন।

২) সঠিক বালিশ ঘুমের ভঙ্গি:

খুব উঁচু বা নিচু বালিশ ব্যবহার না করে মাঝারি উচ্চতার বালিশ ব্যবহার করা ভালো। চিৎ হয়ে বা পাশে ঘুমানো উচিত। পেটের উপর ভর দিয়ে ঘুমানো এড়িয়ে চলা জরুরি, কারণ এতে ঘাড়ে বেশি চাপ পড়ে।

৩) হালকা স্ট্রেচিং:

প্রতিদিন ১০ মিনিট হালকা ঘাড়ের ব্যায়াম করলে পেশী নমনীয় থাকে এবং ব্যথা কমে। ধীরে ধীরে মাথা ডানবাম সামনেপেছনে নড়ানোর মতো সহজ স্ট্রেচিং করতে পারেন।

দীর্ঘ সময় একভাবে না থাকা:

একটানা বসে বা একই অবস্থায় থাকলে ঘাড়ে চাপ বাড়ে। তাই প্রতি ৩০৪০ মিনিট পরপর একটু বিরতি নিন, উঠে দাঁড়ান বা হালকা নড়াচড়া করুন।

মোবাইল কম্পিউটার ব্যবহারে সতর্কতা –

মোবাইল ব্যবহার করার সময় মাথা নিচু না করে চোখের সমান উচ্চতায় রাখার চেষ্টা করুন। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে না তাকিয়ে মাঝেমধ্যে বিরতি নিন।

হালকা ম্যাসাজ বিশ্রাম –

ঘাড়ে হালকা ম্যাসাজ করলে পেশীর টান কমে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম মানসিক চাপ কমানোও ব্যথা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

 সার্ভিকাল স্পন্ডাইলোসিস প্রতিরোধে করণীয়:

সার্ভিকাল স্পন্ডাইলোসিসকে পুরোপুরি ঠেকানো না গেলেও, এর তীব্রতা দ্রুততা কমানো সম্ভব:

  • ঘাড়ের ব্যায়াম করুন: দিনে বার হালকাভাবে ঘাড় ডানেবামে, সামনেপেছনে করুন। ঘাড় ঘোরাবেন না, এতে চাপ বেশি পড়ে।
  • সঠিক বালিশ নির্বাচন: ঘুমানোর সময় বালিশ খুব উঁচু বা খুব নিচু না হয়ে, ঘাড়ের স্বাভাবিক বক্রতাকে সাপোর্ট করে এমন বালিশ ব্যবহার করুন।
  • হাইড্রেটেড থাকুন: ডিস্কের স্বাস্থ্যের জন্য পানি অপরিহার্য।
  • ধূমপান ছাড়ুন: ধূমপান ডিস্কে রক্ত সরবরাহ কমিয়ে দেয়, যা ডিজেনারেশন ত্বরান্বিত করে।
  • অফিসে নিয়মিত বিরতি: প্রতি ৩০৪৫ মিনিট পরপর চেয়ার থেকে উঠুন, ঘাড় কাঁধ নেড়ে নিন, কিছুক্ষণ হাঁটুন।

শেষ কথা:

সার্ভিকাল স্পন্ডাইলোসিস আজকের যান্ত্রিক জীবনের এক অনিবার্য সঙ্গী হয়ে উঠেছে। ভয় পাবার কিছু নেই। এটি একটি manageable সমস্যা, অর্থাৎ সচেতনতা, সঠিক চিকিৎসা এবং জীবনযাত্রায় সামান্য পরিবর্তন এনে এর জটিলতা অনেকটাই এড়ানো সম্ভব। ঘাড়ের ব্যথা বা হাতে ঝিঁঝিঁ ধরা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে অবহেলা না করে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

চিকিৎসা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়। কারও শুধু এক্সারসাইজেই কাজ হয়, কারও ওষুধ+থেরাপি লাগে। সবচেয়ে বড় কথাধৈর্য ধরো এবং নিয়মিত ফলোআপ করুন। অনেকে মাসের মধ্যে অনেকটা সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং সঠিক অভ্যাস মেনে চললে বছরের পর বছর ভালো থাকেন।

আপনার যদি এখনো লক্ষণ থাকে, তাহলে একজন অর্থোপেডিক বা নিউরোলজিস্টের কাছে গিয়ে পরামর্শ নিন। নিজে নিজে ওষুধ বা এক্সারসাইজ শুরু করবেন নাভুল হলে সমস্যা বাড়তে পারে। ছোট ছোট পরিবর্তন আজ থেকেই শুরু করুন, দেখবেন ঘাড় আপনাকে আর কষ্ট দিতে পারবে না। সুস্থ থাকুন, সোজা হয়ে বসুন!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *